ঢাকা ০৪:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
Logo আটঘরিয়ায় জলাবদ্ধতা নিরসনে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত Logo চাটমোহরে সার মজুত করে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ Logo পাবনায় শিশু কলি হত্যার বিচার দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত Logo চাটমোহরে দিনমজুর হত্যা মামলায় নিরীহ ব্যক্তিদের জড়ানোর প্রতিবাদে গ্রামবাসীর মানববন্ধন ও প্রতিবাদ Logo র‍্যাব বিলুপ্ত হয়ে নতুন নামে যাত্রা শুরু Logo নিখোঁজের সাতদিন পর ডোবায় মিলল শিশু কলির বস্তাবন্দি মরদেহ; পরিবারের দাবি হত্যা Logo ধর্ষণের শিকার পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী Logo চাটমোহরে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত Logo দুই শিক্ষার্থী অপহরণ চক্রের ৮ সদস্য গ্রেফতার,উদ্ধার দুই কলেজ শিক্ষার্থী Logo ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে ৭ শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি দেড় হাজারের বেশি

তাড়াশে শিক্ষা বাণিজ্য: প্রতিবন্ধী স্কুলে তালা ও হাঁসের খামার

নিজস্ব প্রতিবেদক :
  • আপডেট সময় : ০৮:০০:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬ ৮৫ বার পঠিত
136

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে দুটি প্রতিবন্ধী স্কুলের একটিতে ঝুলছে তালা, অপরটিতে গড়ে তোলা হয়েছে হাঁসের খামার। লাখ লাখ টাকা ডোনেশন (অনুদান) দিয়ে চাকরি নেওয়া শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী এখন পথে পথে ঘুরছেন। আর প্রায় পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে শিক্ষা বাণিজ্য করে প্রতিষ্ঠাতারা রয়েছেন লাপাত্তা। এসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের নজরদারির অভাব ও বিচারহীনতায় একঝাঁক বেকার তরুণের স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে শিক্ষকরা জানান, স্কুল বন্ধ, ভবিষ্যৎ অন্ধকার—এক দুর্বিসহ জীবন তাদের কাটাতে হচ্ছে। কৌশলে তাদের টাকা হাতিয়ে নিলেও প্রতিষ্ঠাতারা দোষছেন প্রধান শিক্ষককে, আর প্রধান শিক্ষক দোষছেন প্রতিষ্ঠাতাকে। তাদের এসব কাদা ছোড়াছুড়িতে শিক্ষক-কর্মচারীরা চাকরি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে প্রতিষ্ঠাতাদের কেউ অসুস্থতার ভান করছেন, আবার কেউ প্রভাবশালীদের দিয়ে তদবির করছেন।
জানা যায়, ২০১৭ সালে তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হক পৌর সদরের কাউরাইল বাজারে তার স্ত্রী তাহিরা হক ও নিজ নামে গড়ে তোলেন ‘তাহিরা-হক প্রতিবন্ধী বিদ্যানিকেতন’। এলাকায় প্রচার চালানো হয় যে, সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল একজন অটিজম বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক। সুতরাং প্রতিবন্ধী স্কুলের সরকারি অনুদান এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) পেতে কোনো অসুবিধা হবে না।
এ কথায় আকৃষ্ট হয়ে স্কুলটির বিভিন্ন পদে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে ডোনেশন দিয়ে প্রায় শতাধিক বেকার তরুণ-তরুণী চাকরি নেয়। কেউ কেউ স্কুলের জন্য জমি লিখে দিয়েও চাকরিতে যোগ দেন। ওই জমির ওপর টিনশেড ঘর তুলে ঢাকঢোল পিটিয়ে শুরু হয় কার্যক্রম।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয় একজন প্রধান শিক্ষক, একজন সহকারী প্রধান শিক্ষক, ২০ জন সহকারী শিক্ষক, ৬০ জন শিক্ষা সহায়ক ও আয়া, পিয়ন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মালি, নাইটগার্ডসহ আরও ২০ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী।
প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ব্যবহার করা হয় মো. আব্দুল হকের নাম, আর সভাপতি হন তার স্ত্রী তাহিরা হক। নামকাওয়াস্তে একটি ম্যানেজিং কমিটি গঠন করে এমপিও করার নামে প্রায় চার কোটি টাকা সুকৌশলে হাতিয়ে নেন তারা। প্রতিষ্ঠানটি চলে সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অসুস্থতার অজুহাতে আব্দুল হক ও তাহিরা হক আত্মগোপনে চলে যান।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের গেটে তালা ঝুলছে। স্থানীয়রা জানান, সরকারের পতনের পর থেকে আর স্কুলটি খোলা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, স্কুলের জমি বিক্রি ও এফডিআর ভেঙে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হলেও কেউ বাড়াবাড়ি করলে টাকা না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষকরা হতাশ হয়ে বলেন, টাকা কবে পাবো জানি না। চাকরির বয়স শেষ—কী করবো, কোথায় যাবো কিছুই বুঝতে পারছি না।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শাহাদৎ হোসেন বলেন, বর্তমানে তিনি মুন্সিগঞ্জে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। বিল হলে স্কুলে ফিরবেন। ডোনেশনের টাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব বিষয় প্রতিষ্ঠাতারা জানেন।
অন্যদিকে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তাহিরা হক বলেন, আব্দুল হক অসুস্থ। এসব বিষয়ে প্রধান শিক্ষক জানেন।
কিন্তু নিয়োগপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিটি নিয়োগপত্রে তাহিরা হকের স্বাক্ষর রয়েছে এবং সব আর্থিক লেনদেন তারাই করেছেন। এমনকি স্কুলের ৩২ শতাংশ জমিও কালাচাঁদ সূত্রধরের ছেলে জীবন সূত্রধরের কাছ থেকে চাকরির শর্তে রেজিস্ট্রি করে নেওয়া হয়েছে।
জীবন সূত্রধর বলেন, চাকরিও হলো না, জমিটাও চলে গেল।
তাহিরা-হক স্কুলের দেখাদেখি ২০১৫ সালে কামারশোন গ্রামে গড়ে ওঠে ‘চলনবিল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়’। প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মো. জহুরুল হক শেখ, সগুনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি।
শিক্ষকদের অভিযোগ, নিয়োগের নামে প্রায় এক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন জহুরুল হক শেখ। ৫ আগস্টের পর তিনি লাপাত্তা হয়ে যান, পরে এলাকায় ফিরে আসেন। বর্তমানে স্কুলটি বন্ধ এবং সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে হাঁসের খামার।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুসরাত জাহান বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই, খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ট্যাগস :

তাড়াশে শিক্ষা বাণিজ্য: প্রতিবন্ধী স্কুলে তালা ও হাঁসের খামার

আপডেট সময় : ০৮:০০:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
136

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে দুটি প্রতিবন্ধী স্কুলের একটিতে ঝুলছে তালা, অপরটিতে গড়ে তোলা হয়েছে হাঁসের খামার। লাখ লাখ টাকা ডোনেশন (অনুদান) দিয়ে চাকরি নেওয়া শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী এখন পথে পথে ঘুরছেন। আর প্রায় পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে শিক্ষা বাণিজ্য করে প্রতিষ্ঠাতারা রয়েছেন লাপাত্তা। এসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের নজরদারির অভাব ও বিচারহীনতায় একঝাঁক বেকার তরুণের স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে শিক্ষকরা জানান, স্কুল বন্ধ, ভবিষ্যৎ অন্ধকার—এক দুর্বিসহ জীবন তাদের কাটাতে হচ্ছে। কৌশলে তাদের টাকা হাতিয়ে নিলেও প্রতিষ্ঠাতারা দোষছেন প্রধান শিক্ষককে, আর প্রধান শিক্ষক দোষছেন প্রতিষ্ঠাতাকে। তাদের এসব কাদা ছোড়াছুড়িতে শিক্ষক-কর্মচারীরা চাকরি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে প্রতিষ্ঠাতাদের কেউ অসুস্থতার ভান করছেন, আবার কেউ প্রভাবশালীদের দিয়ে তদবির করছেন।
জানা যায়, ২০১৭ সালে তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল হক পৌর সদরের কাউরাইল বাজারে তার স্ত্রী তাহিরা হক ও নিজ নামে গড়ে তোলেন ‘তাহিরা-হক প্রতিবন্ধী বিদ্যানিকেতন’। এলাকায় প্রচার চালানো হয় যে, সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল একজন অটিজম বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক। সুতরাং প্রতিবন্ধী স্কুলের সরকারি অনুদান এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) পেতে কোনো অসুবিধা হবে না।
এ কথায় আকৃষ্ট হয়ে স্কুলটির বিভিন্ন পদে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে ডোনেশন দিয়ে প্রায় শতাধিক বেকার তরুণ-তরুণী চাকরি নেয়। কেউ কেউ স্কুলের জন্য জমি লিখে দিয়েও চাকরিতে যোগ দেন। ওই জমির ওপর টিনশেড ঘর তুলে ঢাকঢোল পিটিয়ে শুরু হয় কার্যক্রম।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয় একজন প্রধান শিক্ষক, একজন সহকারী প্রধান শিক্ষক, ২০ জন সহকারী শিক্ষক, ৬০ জন শিক্ষা সহায়ক ও আয়া, পিয়ন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মালি, নাইটগার্ডসহ আরও ২০ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী।
প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ব্যবহার করা হয় মো. আব্দুল হকের নাম, আর সভাপতি হন তার স্ত্রী তাহিরা হক। নামকাওয়াস্তে একটি ম্যানেজিং কমিটি গঠন করে এমপিও করার নামে প্রায় চার কোটি টাকা সুকৌশলে হাতিয়ে নেন তারা। প্রতিষ্ঠানটি চলে সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অসুস্থতার অজুহাতে আব্দুল হক ও তাহিরা হক আত্মগোপনে চলে যান।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের গেটে তালা ঝুলছে। স্থানীয়রা জানান, সরকারের পতনের পর থেকে আর স্কুলটি খোলা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, স্কুলের জমি বিক্রি ও এফডিআর ভেঙে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হলেও কেউ বাড়াবাড়ি করলে টাকা না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষকরা হতাশ হয়ে বলেন, টাকা কবে পাবো জানি না। চাকরির বয়স শেষ—কী করবো, কোথায় যাবো কিছুই বুঝতে পারছি না।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শাহাদৎ হোসেন বলেন, বর্তমানে তিনি মুন্সিগঞ্জে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। বিল হলে স্কুলে ফিরবেন। ডোনেশনের টাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব বিষয় প্রতিষ্ঠাতারা জানেন।
অন্যদিকে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তাহিরা হক বলেন, আব্দুল হক অসুস্থ। এসব বিষয়ে প্রধান শিক্ষক জানেন।
কিন্তু নিয়োগপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিটি নিয়োগপত্রে তাহিরা হকের স্বাক্ষর রয়েছে এবং সব আর্থিক লেনদেন তারাই করেছেন। এমনকি স্কুলের ৩২ শতাংশ জমিও কালাচাঁদ সূত্রধরের ছেলে জীবন সূত্রধরের কাছ থেকে চাকরির শর্তে রেজিস্ট্রি করে নেওয়া হয়েছে।
জীবন সূত্রধর বলেন, চাকরিও হলো না, জমিটাও চলে গেল।
তাহিরা-হক স্কুলের দেখাদেখি ২০১৫ সালে কামারশোন গ্রামে গড়ে ওঠে ‘চলনবিল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়’। প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মো. জহুরুল হক শেখ, সগুনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি।
শিক্ষকদের অভিযোগ, নিয়োগের নামে প্রায় এক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন জহুরুল হক শেখ। ৫ আগস্টের পর তিনি লাপাত্তা হয়ে যান, পরে এলাকায় ফিরে আসেন। বর্তমানে স্কুলটি বন্ধ এবং সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে হাঁসের খামার।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুসরাত জাহান বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই, খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।